ঢাকা , শনিবার, ০২ মার্চ ২০২৪, ১৯ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo বেইলি রোডে অগ্নিকান্ডে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৬, দগ্ধরাও সংকটাপন্ন: স্বাস্থ্যমন্ত্রী Logo সাত প্রতিমন্ত্রীর শপথ গ্রহণ Logo আলো ঝলমলে রাতে বিপিএলের চ্যাম্পিয়ন বরিশাল Logo ফতুল্লায় নাসিম ওসমান স্মৃতি ক্রিকেট টুর্নামেন্টের পুরস্কার বিতরণ Logo সোনারগাঁয়ের মোগরাপাড়া চৌরাস্তা এলাকায় ফুট ওভার ব্রীজ হকার মুক্ত করলেন এম পি কাউসার হাসনাত Logo নাঃগঞ্জে মহান শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে বইমেলায় কবিদের উত্তরীয় দিয়ে বরণ Logo সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার হাউজ স্কুলে ভর্তি বানিজ্য, ভর্তিতে অনিশ্চিত জমজ শিশু, প্রধান প্রকৌশলীর বদলির দাবি Logo উপজেলা নির্বাচনে সবার সহযোগিতা ও দোয়া চাইলেন মাকসুদ চেয়ারম্যান Logo বৃহত্তম মদনগঞ্জ পেশাজীবি শ্রমিক কল্যান সংগঠন’র ৫ ম বারের মতো বিনামূল্যে সুন্নতে খাৎনা অনুষ্ঠিত Logo বন্দরে গৃহবধূকে কুপিয়ে হত্যা ও স্বামী গুরুত্বর জখমের ঘটনায় মা ও ছেলে আটক

পরিবর্তনের বার্তায় নতুন বছর

অবিরত ঘুরছে ঘড়ির কাটা। সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না। ঘণ্টা যায়, দিন যায়, মাস যায়, কেটে যায় বছর। অতপর উদয় হয় নতুন বছর। ২০২২ সালের ঘড়ির কাটা ঘুরতে ঘুরতে চলে এলো আরো একটি বছর। নতুন বছরের নতুন দিনে সবার জীবন উজ্জীবিত হোক নবযৌবনের মতো। বিদায়ী বছরের সব কষ্টকে পেছনে ফেলে নতুন বছরে সর্বোত্রই প্রতিষ্ঠিত হোক মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায় বিচার। বিদায় ২০২২, স্বাগতম ২০২৩। আজ ২০২৩ সালের প্রথম দিন। অসীমের পানে মহাকালের যাত্রায় সূচিত হলো আরেকটি মাইলফলক। মহাকালের এই যাত্রায় একেকটি বছর এলো নতুন উদ্দীপনা ও প্রেরণা নিয়ে। আমরা মুছে ফেলি গত হয়ে যাওয়া বছরের গ্লানি, যাতনা, না পাওয়ার দুঃখ-বেদনা, উৎসাহ খুঁজি সুখকর ঘটনাগুলো থেকে, এগিয়ে যাই অগ্রগতির দিকে।

বাংলা ক্যালেন্ডারে আজ ১৭ পৌষ, ইংরেজি ২০২৩ সালের পহেলা জানুয়ারি; কুয়াশার চাদর ভেদ করে প্রকৃতির নিময়েই পূর্বাকাশে উঠেছে নতুন সূর্য। অতীতের হিংসা-বিদ্বেষ পেছনে ফেলে, সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির সম্মিলনে এগিয়ে যাওয়ার প্রথম দিন। গতকাল শুক্রবার সূর্যোস্তের মধ্য দিয়ে কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে ২০২২ সাল। আজকের সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো ২০২৩ সালের দিনপঞ্জি। স্বাগত ২০২৩। হ্যাপি নিউ ইয়ার (শুভ নববর্ষ)।

কেমন কেটেছে বিদায়ী বছরটি? ২০২২ সাল দেশের মানুষের জন্য ছিল পরিবর্তনের বছর। বছরের শেষ দিনগুলোতে রাজপথে রাজনীতি ফিরে এসেছে। দীর্ঘ এক যুগ কার্যত ঘরবন্দি-পঙ্গুত্বের কালোমেঘে রাজনীতি ঢাকা ছিল। বছরজুড়েই ছিল সংকট, অনিশ্চয়তা আর অস্থিরতা। মেগা প্রকল্পের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকলেও নানাবিধ সংকট তথা ডলার সংকট, ব্যাংকের প্রতি ভোক্তার আস্থাহীনতা, নানা সংশয়, অস্থিরতা, অঘটন, উত্তেজনা, অনিশ্চয়তা, ভোগান্তি, মানবাধিকার নিয়ে দেশ-বিদেশে নানা বিতর্ক, আতঙ্ক, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি মধ্যদিয়ে কেটে গেছে বছরটি।

২০১৪ ও ২০১৮ সালের বিতর্কিত দু’টি জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বছরের পর বছরজুড়ে রাজনীতি ছিল নিস্তেজ, হীমঘরে। সেই হীমঘর থেকে বেরিয়ে বছরের শেষ দিকে রাজনীতি বিভিন্ন ইস্যুতে হঠাৎ মাঠে উত্তাপ ছড়িয়েছে। বছরের মাঝামাঝি সময়ে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন, বছরের শেষ পর্যায়ে ঢাকার মেট্রোরেল যুগে প্রবেশ মানুষের কাছে যেমন সুখকর ঘটনা ছিল; তেমনি বছরজুড়ে রাজনৈতিক হানাহানি, ডলার সংকটে অর্থনীতির বিপর্যয়, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে জনগণের ভোগান্তি, ভাড়া বৃদ্ধির নামে নৈরাজ্যকর পরিবহন খাত, শিক্ষার্থী আন্দোলন, পণ্যমূল্য বৃদ্ধি, জনগণের ভোটের অধিকার-গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন এবং দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে বিতর্ক চলেছে। খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ বিভিন্ন দাবিতে বাকযুদ্ধ বিতর্কের; বিপরীতে ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রচারণা।

বিগত ২০২২ সালের মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ বিশিষ্টজনরা বিভিন্নভাবে করছেন। নির্মোহ বিশ্লেষণ করা সত্যিই কঠিন। মোটা দাগে বলতে গেলে বলা যায় বছরের শেষ দিকে রাজনীতিতে ‘আলোর দিশা’ দেখালেও বছরজুড়ে ইতিবাচক খবরের চেয়ে নেতিবাচক খবর মিডিয়ায় বেশি ঘুরপাক খেয়েছে। পণ্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে কর্মজীবী মানুষের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেড়েছে। বিপুলসংখ্যক মানুষ চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন। দেশে গরিব যেমন বেড়েছে, তেমনি কোটিপতির সংখ্যাও বেড়েছে। বিদেশে টাকা পাচার বেড়েছে। ধনী-গরিবের মধ্যে বৈষম্য বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে। সামজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে ছিল সামাজিক অস্থিরতা। ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি, সরকারি ও বেসরকারি খাত, শিল্প-কারখানা, ক্ষুদ্র ব্যবসা সব ক্ষেত্রেই বছরজুড়ে ছিল অচলাবস্থা। ব্যাংক খাতে অনিশ্চয়তা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে নতুন করে নিষেধাজ্ঞার ভীতি। জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষি ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়ায় ব্যাহত হয়েছে উৎপাদন। ডলার সংকটে আমদানি-রফতানিতে পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব। কমে গেছে আমদানি-রফতানি। গার্মেন্টসসহ শিল্প খাতের বহু মানুষ ছাঁটাইয়ের শিকার হয়েছেন। কিছু কিছু কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে বহু কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। নানা ঘটন-অঘটনের সাক্ষী ২০২২ সাল রাজনীতি, গণতন্ত্র, বিরোধী দলের আন্দোলনসহ নানা ইস্যুতে দেশে অস্থিরতা, বিক্ষোভ, সহিংসতা, হামলা-মামলা গ্রেফতার। তবে সবচেয়ে বড় ঘটনা ফের রাজনীতি মাঠে ফিরে আসার বছর। মানুষের অধিকার আদায়ে রাজনৈতিক দলগুলো একাট্ট হয়ে কর্মসূচি দেয়ার পথে হাঁটতে শুরু করেছে।

বিদায়ী বছরের সবচেয়ে বেশি আলোচিত এবং উত্তাপ্ত ছড়ানোর তারিখ ১০ ডিসেম্বর ঘিরে। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আমানউল্লাহ আমান ঘোষণা দেন ‘১০ ডিসেম্বরের পর বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের কথায় দেশ চলবে। ১০ ডিসেম্বরের পর তারেক রহমান দেশে ফিরে আসবে।’ কি হবে ১০ ডিসেম্বর? এই প্রশ্ন ভারি হয়ে উঠেছিল রাজনীতির বাতাস। ক্ষমতাসীনদের মধ্যেও ভীতি-আতঙ্ক ছড়িয়েছিল। ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশ ডেকেছিল বিএনপি। বিএনপির এই ঢাকা বিভাগীয় সমাবেশ নিয়ে অনেক নাটক হয়েছে। কিন্তু ওই দিন বিএনপির স্মরণকালের গণসমাবেশে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। তবে ওই কর্মসূচিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দল ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের পুলিশের মতোই রাজপথে প্রহরা, তল্লাশি চৌকি বসানো রাজনীতিতে নেতিবাচক সূচকের জন্ম দিয়েছে।

ওই সমাবেশের আগে বিএনপির কয়েকশ’ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। ওই কর্মসূচি পালনের পর ১৯ ডিসেম্বর বিএনপির ‘রাষ্ট্র মেরামতের ২৭ দফা রূপরেখা’ দেশের রাজনীতিতে ঝাঁকুনি দিয়েছে। ওই রূপরেখা ঘিরে ডান-বাম-মধ্যপন্থি ৭৩টি রাজনৈতিক দল পৃথক পৃথকভাবে কয়েকটি জোট গঠনের মাধ্যমে যুগপৎ আন্দোলন শুরু করেছে।

মাঠের বিরোধী দল বিএনপির আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পতনের প্রস্তুতি অন্যদিকে বিএনপি রাজপথে ঠেকাতে আওয়ামী লীগ ১৪ দলীয় জোটকে আরো গতিশীল করেছে। পাশাপাশি রাজপথে বিএনপিকে মোকাবিলা করার লক্ষ্যে দলকে শক্তিশালী করতে ২৪ ডিসেম্বর দলের ২২তম জাতীয় কাউন্সিল করেছে। কাউন্সিলে নেতৃত্বে তেমন পরিবর্তন হয়নি; পুনরায় শেখ হাসিনা সভাপতি এবং ওবায়দুল কাদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন। মূল দলের পাশাপাশি ছাত্রলীগ, মহিলা লীগ, কৃষক লীগ, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ, যুব মহিলা লীগ, শ্রমিক লীগসহ ভ্রাতৃপ্রতীম সহযোগী সংগঠনগুলোতে চাঙা করতে জাতীয় সম্মেলন করেছে। তারও আগে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করতে মহানগর, জেলা, উপজেলা ও থানা-পর্যায়ের সম্মেলন করেছে দলটি।

বছরজুড়ে মানবাধিকার লংঘনের দায়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফের ‘নিষেধাজ্ঞা’ আশঙ্কা যেমন ছিল; তেমনি আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিদেশী কূটনীতিকদের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। যুক্তরাষ্ট্রের ‘গণতন্ত্র সম্মেলন’ তালিকা থেকে বাংলাদেশের নাম বাদ দেয়া নিয়ে ব্যপক আলোচনা-বিতর্ক হয়েছে। একই সঙ্গে র‌্যাবের কয়েকজনের উপর থেকে মার্কিন ‘নিষেধাজ্ঞা’ তুলে নেয়ার লক্ষ্যে ওয়াশিংটনে লবিস্ট নিয়োগ পাল্টা লবিস্ট নিয়োগের বিতর্ক হয়। এমনকি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিনকেনকে বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে রাজি করার জন্য অনুরোধ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। এটা নিয়ে বিতর্কের মধ্যে চট্টগ্রামের এক দুর্গা পুঁজায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেনের ‘ভারতকে বলেছি শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখতে যা যা করা প্রয়োজন আপনাদের তা করতে হবে’ বক্তব্য বিতর্কের ঝড় তোলে। অতপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, জাপান, কানাডাসহ প্রভাবশালী দেশগুলোর রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারদের আসন্ন নির্বাচনে জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করার পরামর্শ ও তৎপরতা বছরজুড়ে চলেছে। বছরের শেষ দিকে জাপানের বিদায়ী রাষ্ট্রদূতের ‘বাংলাদেশের রাতের আধারে ভোটের মতো ঘটনা পৃথিবীর কোথাও ঘটেনি’ মন্তব্য উত্তাপ ছড়ায়। আর ১৪ ডিসেম্বর বিএনপির নিখোঁজ নেতা সুমনের শাহিনবাগের বাসায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটর হাসের যাওয়া এবং সেখানে অন্য ‘মায়ের কান্না’ নামে সংগঠনের লোকজন তাকে ঘিরে ধরা নিয়ে নতুন করে উত্তাপ সৃষ্টি করে। সেই উত্তাপ মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় থাকা রাশিয়ান জাহাজের রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পণ্য নিয়ে বাংলাদেশের মংলা সমুদ্র বন্দরে ভিড়ানোর চেষ্টা এবং পরবর্তীতে তা ভারতের বন্দরে পাঠিয়ে দেয়া পর্যন্ত গড়ায়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেনের ‘বাংলাদেশের মানুষ বেহেস্তে রয়েছে’ এবং কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাকের বক্তব্য ‘পদ্মা সেতুর রাস্তা দিয়ে গেলে মনে হয় বেহেস্তে যাচ্ছি’ মন্তব্য ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করে। এছাড়াও ‘খেলা হবে’ শব্দটি বছরজুড়ে আলোচিত হয়।

উন্নয়নের মহাসড়কে উঠা বাংলাদেশে গত বছর দু’টি উন্নয়ন কর্মকাণ্ড আলোচিত হয়েছে। একটি নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন এবং দ্বিতীয়টি ঢাকায় মেট্রোরেল চালু। ২৫ জুন পদ্মা সেতুর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং নির্মাণ প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত। আর ২৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা দিন মেট্রোরেল উদ্বোধন। এই মেট্রোরেল ঢাকা মহানগরীর যানজট নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

লোডশেডিং, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, পণ্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি বছরজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা ও বিতর্কের ইস্যু ছিল। বছরের শেষ দিকে এসে তার সঙ্গে যোগ হয় ডলার সংকট, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রিজার্ভে টান এবং ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের আস্থাহীনতা। ৫ আগস্ট মধ্যরাত থেকে দেশে সকল প্রকার জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যায়। দাম বেড়েছে প্রতি লিটার ডিজেলে ৩৪, কেরোসিনে ৩৪, অকটেনে ৪৬, পেট্রলে ৪৪ টাকা। এই মূল্যবৃদ্ধিকে নজীরবিহীন হিসেবে অবিহিত করে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিবাদ করে। হঠাৎ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ তলানিতে নেমে আসে। কিন্তু প্রথমে সরকার এটা অস্বীকার করলেও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ঋণ নেয়ার প্রস্তাব দেয়ার পর সংস্থাটির প্রতিনিধি দল ঢাকায় এলে তা প্রকাশ পায়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে রিজার্ভের হিসাবে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রিজার্ভ এখনো তলানিতে রয়ে গেছে। আর এ জন্য দেখা দেয় মার্কিন ডলারের চরম সংকট। সরকারের আমদানি দায় পরিশোধে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করতে হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে। অর্থ সংটকে নতুন নোট ছাপাতে হয়েছে। ডলারের অভাবে আমদানি-রফতানি এলসি খোলায় ব্যাঘাত ঘটে। এমনকি সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশে ভ্রমণ সংকুচিত করে আনা হয় এবং উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়া শিক্ষার্থীদের ব্যাংকে ‘নতুন ফাইল’ খোলা বন্ধ রাখা হয়। ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের প্রভাবে সারাবিশ্বের ন্যায় দেশের অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয় এবং জুলাই মাস থেকে এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং শুরু হয়। তবে অর্থনীতির যে ভয়বহ সংকটের আশঙ্কা করা হয়েছিল বছরের শেখ দিকে ততটা সংকট হয়নি।

এ ছাড়াও নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন, চট্টগ্রামের বিএম কন্টেইনার ডিপোতে অগ্নিকাণ্ড, রাজধানীর আলাদত প্রাঙ্গণ থেকে দিনে-দুপুরে ‘ফিল্মি স্টাইলে’ দুই জঙ্গি ছিনতাই, প্রশাসনের সচিবসহ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরসহ অনেক ঘটনা আলোচনায় ছিল।
নতুন বছরে প্রত্যাশা বাংলাদেশের মানুষের অদম্য স্পৃহা ও উদ্ভাবনী শক্তির কাছে অন্ধকার ঘুঁচে যাবে। দেশে আবার ফিরে আসবে শান্তি। সরকারের মেয়াদের শেষ বছর এটি। সংবিধান অনুযায়ী ২০২৪ সালের জানুয়ারির প্রথম সাপ্তাহে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ’৭১ সালে যে উদ্দেশ্যে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল অর্ধশত বছর পরে হলেও তা বাস্তবায়ন হবে। মানুষ ভোটের অধিকার ফিরে পাবে এবং সর্বোক্ষেত্রে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। ক্ষমতাসীন দল, মাঠের বিরোধী দল, অন্যসব রাজনৈতিক দল এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা নতুন বছরটিকে শান্তি-সমৃদ্ধময় ও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলবেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মুছে যাক গ্লানি ঘুচে যাক জরা/ অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা/ বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক’। নতুন বছরে এটাই সবার প্রত্যাশা।

ট্যাগস
আপলোডকারীর তথ্য

কামাল হোসাইন

হ্যালো আমি কামাল হোসাইন, আমি গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছি। ২০১৭ সাল থেকে এই পত্রিকার সাথে কাজ করছি। এভাবে এখানে আপনার প্রতিনিধিদের সম্পর্কে কিছু লিখতে পারবেন।

বেইলি রোডে অগ্নিকান্ডে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৬, দগ্ধরাও সংকটাপন্ন: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

পরিবর্তনের বার্তায় নতুন বছর

আপডেট সময় ০৪:০৯:৪৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ জানুয়ারী ২০২৩

অবিরত ঘুরছে ঘড়ির কাটা। সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না। ঘণ্টা যায়, দিন যায়, মাস যায়, কেটে যায় বছর। অতপর উদয় হয় নতুন বছর। ২০২২ সালের ঘড়ির কাটা ঘুরতে ঘুরতে চলে এলো আরো একটি বছর। নতুন বছরের নতুন দিনে সবার জীবন উজ্জীবিত হোক নবযৌবনের মতো। বিদায়ী বছরের সব কষ্টকে পেছনে ফেলে নতুন বছরে সর্বোত্রই প্রতিষ্ঠিত হোক মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায় বিচার। বিদায় ২০২২, স্বাগতম ২০২৩। আজ ২০২৩ সালের প্রথম দিন। অসীমের পানে মহাকালের যাত্রায় সূচিত হলো আরেকটি মাইলফলক। মহাকালের এই যাত্রায় একেকটি বছর এলো নতুন উদ্দীপনা ও প্রেরণা নিয়ে। আমরা মুছে ফেলি গত হয়ে যাওয়া বছরের গ্লানি, যাতনা, না পাওয়ার দুঃখ-বেদনা, উৎসাহ খুঁজি সুখকর ঘটনাগুলো থেকে, এগিয়ে যাই অগ্রগতির দিকে।

বাংলা ক্যালেন্ডারে আজ ১৭ পৌষ, ইংরেজি ২০২৩ সালের পহেলা জানুয়ারি; কুয়াশার চাদর ভেদ করে প্রকৃতির নিময়েই পূর্বাকাশে উঠেছে নতুন সূর্য। অতীতের হিংসা-বিদ্বেষ পেছনে ফেলে, সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির সম্মিলনে এগিয়ে যাওয়ার প্রথম দিন। গতকাল শুক্রবার সূর্যোস্তের মধ্য দিয়ে কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে ২০২২ সাল। আজকের সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো ২০২৩ সালের দিনপঞ্জি। স্বাগত ২০২৩। হ্যাপি নিউ ইয়ার (শুভ নববর্ষ)।

কেমন কেটেছে বিদায়ী বছরটি? ২০২২ সাল দেশের মানুষের জন্য ছিল পরিবর্তনের বছর। বছরের শেষ দিনগুলোতে রাজপথে রাজনীতি ফিরে এসেছে। দীর্ঘ এক যুগ কার্যত ঘরবন্দি-পঙ্গুত্বের কালোমেঘে রাজনীতি ঢাকা ছিল। বছরজুড়েই ছিল সংকট, অনিশ্চয়তা আর অস্থিরতা। মেগা প্রকল্পের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকলেও নানাবিধ সংকট তথা ডলার সংকট, ব্যাংকের প্রতি ভোক্তার আস্থাহীনতা, নানা সংশয়, অস্থিরতা, অঘটন, উত্তেজনা, অনিশ্চয়তা, ভোগান্তি, মানবাধিকার নিয়ে দেশ-বিদেশে নানা বিতর্ক, আতঙ্ক, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি মধ্যদিয়ে কেটে গেছে বছরটি।

২০১৪ ও ২০১৮ সালের বিতর্কিত দু’টি জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বছরের পর বছরজুড়ে রাজনীতি ছিল নিস্তেজ, হীমঘরে। সেই হীমঘর থেকে বেরিয়ে বছরের শেষ দিকে রাজনীতি বিভিন্ন ইস্যুতে হঠাৎ মাঠে উত্তাপ ছড়িয়েছে। বছরের মাঝামাঝি সময়ে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন, বছরের শেষ পর্যায়ে ঢাকার মেট্রোরেল যুগে প্রবেশ মানুষের কাছে যেমন সুখকর ঘটনা ছিল; তেমনি বছরজুড়ে রাজনৈতিক হানাহানি, ডলার সংকটে অর্থনীতির বিপর্যয়, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে জনগণের ভোগান্তি, ভাড়া বৃদ্ধির নামে নৈরাজ্যকর পরিবহন খাত, শিক্ষার্থী আন্দোলন, পণ্যমূল্য বৃদ্ধি, জনগণের ভোটের অধিকার-গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন এবং দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে বিতর্ক চলেছে। খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ বিভিন্ন দাবিতে বাকযুদ্ধ বিতর্কের; বিপরীতে ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রচারণা।

বিগত ২০২২ সালের মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ বিশিষ্টজনরা বিভিন্নভাবে করছেন। নির্মোহ বিশ্লেষণ করা সত্যিই কঠিন। মোটা দাগে বলতে গেলে বলা যায় বছরের শেষ দিকে রাজনীতিতে ‘আলোর দিশা’ দেখালেও বছরজুড়ে ইতিবাচক খবরের চেয়ে নেতিবাচক খবর মিডিয়ায় বেশি ঘুরপাক খেয়েছে। পণ্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে কর্মজীবী মানুষের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেড়েছে। বিপুলসংখ্যক মানুষ চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন। দেশে গরিব যেমন বেড়েছে, তেমনি কোটিপতির সংখ্যাও বেড়েছে। বিদেশে টাকা পাচার বেড়েছে। ধনী-গরিবের মধ্যে বৈষম্য বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে। সামজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে ছিল সামাজিক অস্থিরতা। ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি, সরকারি ও বেসরকারি খাত, শিল্প-কারখানা, ক্ষুদ্র ব্যবসা সব ক্ষেত্রেই বছরজুড়ে ছিল অচলাবস্থা। ব্যাংক খাতে অনিশ্চয়তা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে নতুন করে নিষেধাজ্ঞার ভীতি। জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষি ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়ায় ব্যাহত হয়েছে উৎপাদন। ডলার সংকটে আমদানি-রফতানিতে পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব। কমে গেছে আমদানি-রফতানি। গার্মেন্টসসহ শিল্প খাতের বহু মানুষ ছাঁটাইয়ের শিকার হয়েছেন। কিছু কিছু কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে বহু কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। নানা ঘটন-অঘটনের সাক্ষী ২০২২ সাল রাজনীতি, গণতন্ত্র, বিরোধী দলের আন্দোলনসহ নানা ইস্যুতে দেশে অস্থিরতা, বিক্ষোভ, সহিংসতা, হামলা-মামলা গ্রেফতার। তবে সবচেয়ে বড় ঘটনা ফের রাজনীতি মাঠে ফিরে আসার বছর। মানুষের অধিকার আদায়ে রাজনৈতিক দলগুলো একাট্ট হয়ে কর্মসূচি দেয়ার পথে হাঁটতে শুরু করেছে।

বিদায়ী বছরের সবচেয়ে বেশি আলোচিত এবং উত্তাপ্ত ছড়ানোর তারিখ ১০ ডিসেম্বর ঘিরে। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আমানউল্লাহ আমান ঘোষণা দেন ‘১০ ডিসেম্বরের পর বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের কথায় দেশ চলবে। ১০ ডিসেম্বরের পর তারেক রহমান দেশে ফিরে আসবে।’ কি হবে ১০ ডিসেম্বর? এই প্রশ্ন ভারি হয়ে উঠেছিল রাজনীতির বাতাস। ক্ষমতাসীনদের মধ্যেও ভীতি-আতঙ্ক ছড়িয়েছিল। ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশ ডেকেছিল বিএনপি। বিএনপির এই ঢাকা বিভাগীয় সমাবেশ নিয়ে অনেক নাটক হয়েছে। কিন্তু ওই দিন বিএনপির স্মরণকালের গণসমাবেশে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। তবে ওই কর্মসূচিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দল ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের পুলিশের মতোই রাজপথে প্রহরা, তল্লাশি চৌকি বসানো রাজনীতিতে নেতিবাচক সূচকের জন্ম দিয়েছে।

ওই সমাবেশের আগে বিএনপির কয়েকশ’ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। ওই কর্মসূচি পালনের পর ১৯ ডিসেম্বর বিএনপির ‘রাষ্ট্র মেরামতের ২৭ দফা রূপরেখা’ দেশের রাজনীতিতে ঝাঁকুনি দিয়েছে। ওই রূপরেখা ঘিরে ডান-বাম-মধ্যপন্থি ৭৩টি রাজনৈতিক দল পৃথক পৃথকভাবে কয়েকটি জোট গঠনের মাধ্যমে যুগপৎ আন্দোলন শুরু করেছে।

মাঠের বিরোধী দল বিএনপির আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পতনের প্রস্তুতি অন্যদিকে বিএনপি রাজপথে ঠেকাতে আওয়ামী লীগ ১৪ দলীয় জোটকে আরো গতিশীল করেছে। পাশাপাশি রাজপথে বিএনপিকে মোকাবিলা করার লক্ষ্যে দলকে শক্তিশালী করতে ২৪ ডিসেম্বর দলের ২২তম জাতীয় কাউন্সিল করেছে। কাউন্সিলে নেতৃত্বে তেমন পরিবর্তন হয়নি; পুনরায় শেখ হাসিনা সভাপতি এবং ওবায়দুল কাদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন। মূল দলের পাশাপাশি ছাত্রলীগ, মহিলা লীগ, কৃষক লীগ, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ, যুব মহিলা লীগ, শ্রমিক লীগসহ ভ্রাতৃপ্রতীম সহযোগী সংগঠনগুলোতে চাঙা করতে জাতীয় সম্মেলন করেছে। তারও আগে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করতে মহানগর, জেলা, উপজেলা ও থানা-পর্যায়ের সম্মেলন করেছে দলটি।

বছরজুড়ে মানবাধিকার লংঘনের দায়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফের ‘নিষেধাজ্ঞা’ আশঙ্কা যেমন ছিল; তেমনি আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিদেশী কূটনীতিকদের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। যুক্তরাষ্ট্রের ‘গণতন্ত্র সম্মেলন’ তালিকা থেকে বাংলাদেশের নাম বাদ দেয়া নিয়ে ব্যপক আলোচনা-বিতর্ক হয়েছে। একই সঙ্গে র‌্যাবের কয়েকজনের উপর থেকে মার্কিন ‘নিষেধাজ্ঞা’ তুলে নেয়ার লক্ষ্যে ওয়াশিংটনে লবিস্ট নিয়োগ পাল্টা লবিস্ট নিয়োগের বিতর্ক হয়। এমনকি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিনকেনকে বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে রাজি করার জন্য অনুরোধ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। এটা নিয়ে বিতর্কের মধ্যে চট্টগ্রামের এক দুর্গা পুঁজায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেনের ‘ভারতকে বলেছি শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখতে যা যা করা প্রয়োজন আপনাদের তা করতে হবে’ বক্তব্য বিতর্কের ঝড় তোলে। অতপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, জাপান, কানাডাসহ প্রভাবশালী দেশগুলোর রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারদের আসন্ন নির্বাচনে জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করার পরামর্শ ও তৎপরতা বছরজুড়ে চলেছে। বছরের শেষ দিকে জাপানের বিদায়ী রাষ্ট্রদূতের ‘বাংলাদেশের রাতের আধারে ভোটের মতো ঘটনা পৃথিবীর কোথাও ঘটেনি’ মন্তব্য উত্তাপ ছড়ায়। আর ১৪ ডিসেম্বর বিএনপির নিখোঁজ নেতা সুমনের শাহিনবাগের বাসায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটর হাসের যাওয়া এবং সেখানে অন্য ‘মায়ের কান্না’ নামে সংগঠনের লোকজন তাকে ঘিরে ধরা নিয়ে নতুন করে উত্তাপ সৃষ্টি করে। সেই উত্তাপ মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় থাকা রাশিয়ান জাহাজের রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পণ্য নিয়ে বাংলাদেশের মংলা সমুদ্র বন্দরে ভিড়ানোর চেষ্টা এবং পরবর্তীতে তা ভারতের বন্দরে পাঠিয়ে দেয়া পর্যন্ত গড়ায়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেনের ‘বাংলাদেশের মানুষ বেহেস্তে রয়েছে’ এবং কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাকের বক্তব্য ‘পদ্মা সেতুর রাস্তা দিয়ে গেলে মনে হয় বেহেস্তে যাচ্ছি’ মন্তব্য ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করে। এছাড়াও ‘খেলা হবে’ শব্দটি বছরজুড়ে আলোচিত হয়।

উন্নয়নের মহাসড়কে উঠা বাংলাদেশে গত বছর দু’টি উন্নয়ন কর্মকাণ্ড আলোচিত হয়েছে। একটি নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন এবং দ্বিতীয়টি ঢাকায় মেট্রোরেল চালু। ২৫ জুন পদ্মা সেতুর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং নির্মাণ প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত। আর ২৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা দিন মেট্রোরেল উদ্বোধন। এই মেট্রোরেল ঢাকা মহানগরীর যানজট নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

লোডশেডিং, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, পণ্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি বছরজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা ও বিতর্কের ইস্যু ছিল। বছরের শেষ দিকে এসে তার সঙ্গে যোগ হয় ডলার সংকট, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রিজার্ভে টান এবং ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের আস্থাহীনতা। ৫ আগস্ট মধ্যরাত থেকে দেশে সকল প্রকার জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যায়। দাম বেড়েছে প্রতি লিটার ডিজেলে ৩৪, কেরোসিনে ৩৪, অকটেনে ৪৬, পেট্রলে ৪৪ টাকা। এই মূল্যবৃদ্ধিকে নজীরবিহীন হিসেবে অবিহিত করে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিবাদ করে। হঠাৎ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ তলানিতে নেমে আসে। কিন্তু প্রথমে সরকার এটা অস্বীকার করলেও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ঋণ নেয়ার প্রস্তাব দেয়ার পর সংস্থাটির প্রতিনিধি দল ঢাকায় এলে তা প্রকাশ পায়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে রিজার্ভের হিসাবে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রিজার্ভ এখনো তলানিতে রয়ে গেছে। আর এ জন্য দেখা দেয় মার্কিন ডলারের চরম সংকট। সরকারের আমদানি দায় পরিশোধে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করতে হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে। অর্থ সংটকে নতুন নোট ছাপাতে হয়েছে। ডলারের অভাবে আমদানি-রফতানি এলসি খোলায় ব্যাঘাত ঘটে। এমনকি সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশে ভ্রমণ সংকুচিত করে আনা হয় এবং উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়া শিক্ষার্থীদের ব্যাংকে ‘নতুন ফাইল’ খোলা বন্ধ রাখা হয়। ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের প্রভাবে সারাবিশ্বের ন্যায় দেশের অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয় এবং জুলাই মাস থেকে এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং শুরু হয়। তবে অর্থনীতির যে ভয়বহ সংকটের আশঙ্কা করা হয়েছিল বছরের শেখ দিকে ততটা সংকট হয়নি।

এ ছাড়াও নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন, চট্টগ্রামের বিএম কন্টেইনার ডিপোতে অগ্নিকাণ্ড, রাজধানীর আলাদত প্রাঙ্গণ থেকে দিনে-দুপুরে ‘ফিল্মি স্টাইলে’ দুই জঙ্গি ছিনতাই, প্রশাসনের সচিবসহ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরসহ অনেক ঘটনা আলোচনায় ছিল।
নতুন বছরে প্রত্যাশা বাংলাদেশের মানুষের অদম্য স্পৃহা ও উদ্ভাবনী শক্তির কাছে অন্ধকার ঘুঁচে যাবে। দেশে আবার ফিরে আসবে শান্তি। সরকারের মেয়াদের শেষ বছর এটি। সংবিধান অনুযায়ী ২০২৪ সালের জানুয়ারির প্রথম সাপ্তাহে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ’৭১ সালে যে উদ্দেশ্যে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল অর্ধশত বছর পরে হলেও তা বাস্তবায়ন হবে। মানুষ ভোটের অধিকার ফিরে পাবে এবং সর্বোক্ষেত্রে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। ক্ষমতাসীন দল, মাঠের বিরোধী দল, অন্যসব রাজনৈতিক দল এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা নতুন বছরটিকে শান্তি-সমৃদ্ধময় ও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলবেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মুছে যাক গ্লানি ঘুচে যাক জরা/ অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা/ বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক’। নতুন বছরে এটাই সবার প্রত্যাশা।