ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

কনস্যুলার অ্যাকাউন্টের এত টাকা কোথায় গেল?

বৈদেশিক মিশনগুলোর মধ্যে ৬২টি কনস্যুলার অ্যাকাউন্ট থেকে পৌনে ৪ হাজার কোটি টাকার কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। একইসঙ্গে বৈদেশিক মিশনগুলোর আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার গুরুতর লঙ্ঘন ধরা পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এ খাতে অস্বচ্ছতা ও বিশৃঙ্খলাকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাত হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও সরকারের দায়িত্বশীল মহল একে শ্রেফ দুই মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতা বলে আখ্যায়িত করেছে, যাকে প্রকারান্তরে দায়মুক্তি দেয়ার প্রয়াস বলে গণ্য করা যায়। অস্বাভাবিক মাত্রায় অর্থপাচার ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ঘাটতির কারণে দেশে মূল্যস্ফীতিসহ সামাজিক-অর্থনৈতিক খাতে বড় ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে। এহেন বাস্তবতায় সরকার অর্থনৈতিক কৃচ্ছ্রতার নীতি এবং অপ্রয়োজনীয় ও কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে বাজেট বরাদ্দ স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিলেও সিন্ডিকেটেড দুর্নীতি, অর্থপাচার, জালিয়াতির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের প্রক্রিয়া এখনো বন্ধ হয়নি। বৈদেশিক মিশন ও কনস্যুলার অফিসগুলো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধিভুক্ত নিয়মতান্ত্রিক সরকারি প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের জনবল ও আয়-ব্যয়ের হিসাব সরকারি বিধি মোতাবেক নিরীক্ষণ ও তদারকির আওতায় থাকার কথা। এ ক্ষেত্রে যে কোনো ব্যত্যয়, অস্বচ্ছতা ও সমন্বয়হীনতার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের সামগ্রিক কর্মসংস্থান ও জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত বৈদেশিক কর্মসংস্থান, পর্যটন ও রফতানি বাণিজ্যের প্রমোশনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বৈদেশিক মিশনগুলোর উপর। বিদেশে কর্মরত লাখ লাখ কর্মীর পাসপোর্ট, ভিসা প্রসেস ও আইনগত সহায়তাসহ নানাবিধ ডক্যুমেন্টেশনের আনুষাঙ্গিক কাজকর্ম বৈদেশিক মিশনগুলোকে করতে হয়। এসব কাজ করতে গিয়ে প্রবাসী কর্মীদের হয়রানি, ভোগান্তিসহ নানাভাবে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। অন্যান্য দেশের মিশনকে নিজ দেশের কর্মীদের প্রয়োজনে যে ধরনের সহায়তা নিয়ে তৎপর থাকতে দেখা যায় বাংলাদেশ মিশনগুলোর ভূমিকা সে তুলনায় খুবই নগণ্য বলে মনে করেন প্রবাসী কর্মীরা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে মিশনগুলোর কর্মকর্তারা প্রবাসীদের সমস্যা সমাধানে যথাযথ ভূমিকা নিতে পারলে জনশক্তি রফতানির প্রধান বাজারগুলো থেকে রেমিটেন্স আয় আরো বাড়ানো সম্ভব হতো। এসব মৌলিক ও প্রত্যাশিত দায়-দায়িত্ব পালন না করেই বৈদেশিক মিশনগুলোর কর্মকর্তারা জনগণের প্রদেয় অর্থ আত্মসাতে লিপ্ত রয়েছে। একদিকে নিজেরা সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করছে, অন্যদিকে নানাবিধ অপরাধ, প্রতারণা ও জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা চুরি ও পাচার করে বিদেশে পালিয়ে থাকা ব্যক্তিদের সহযোগী হিসেবেও তারা কাজ করছে। রাজনৈতিক-অর্থনৈতিকভাবে একটি ক্রান্তিকালে পড়েছে দেশ। সরকারের দুর্নীতিবাজ আমলারা লুকোচুরি করে, উটপাখির মতো বালিতে মাথা ঢুকিয়ে বড় বড় রাঘব-বোয়াল দুর্নীতিবাজদের যতই আড়াল করতে চান না কেন, কোনো কিছুই আর গোপন থাকছে না। একের পর এক বড় বড় দুর্নীতি ও হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের ঘটনা ফাঁস হওয়ার পরও সরকারের পক্ষ থেকে ধামাচাপা ও প্রকারান্তরে দায়মুক্তির প্রবণতা সম্পর্কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বসাম্প্রতিক বার্ষিক প্রতিবেদনে তথ্যভিত্তিক সমালোচনা করা হয়েছে। সরকারের সংশ্লিষ্টদের পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনের নিষ্ক্রিয়তারও সমালোচনা করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আমাদের দেশের অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে বিদেশি উন্নয়ন অংশীদাররা কথা বলার সুযোগ পাবে, এটা কারো কাম্য নয়। স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন, বিচার বিভাগসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার লাগাম টেনে ধরার ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রভাবশালী দেশের তাগিদকে দেশের মানুষ ইতিবাচকভাবেই গ্রহণ করে থাকে। ৬২টি কনস্যুলার অ্যাকাউন্টে হাজার হাজার কোটি টাকার ঘাপলা সম্পর্কে অভিযোগ খতিয়ে দেখে এ সম্পর্কে অস্বচ্ছতা দূর করা এবং দোষী ব্যক্তিদের জবাবদিহিতা ও বিচার নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। আইনজ্ঞদের মতে, বিধিবহির্ভূতভাবে সরকারি অর্থব্যয় ও আত্মসাতের মতো অভিযোগ প্রমাণিত হলে অর্থদন্ডসহ যাবজ্জীবন পর্যন্ত কারাদন্ডের বিধান রয়েছে। দুদকের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় তদন্ত সাপেক্ষে এ ধরনের অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত করা না হলে বিদেশি মিশনগুলোতে কাজের সমন্বয়হীনতা, দুর্নীতি ও অর্থআত্মসাৎ বন্ধ হবে না। এইসঙ্গে বৈদেশিক মিশনগুলোতে সৎ, দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

ট্যাগস
আপলোডকারীর তথ্য

কামাল হোসাইন

হ্যালো আমি কামাল হোসাইন, আমি গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছি। ২০১৭ সাল থেকে এই পত্রিকার সাথে কাজ করছি। এভাবে এখানে আপনার প্রতিনিধিদের সম্পর্কে কিছু লিখতে পারবেন।

কনস্যুলার অ্যাকাউন্টের এত টাকা কোথায় গেল?

আপডেট সময় ০৪:১৯:৫২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ মার্চ ২০২৩

বৈদেশিক মিশনগুলোর মধ্যে ৬২টি কনস্যুলার অ্যাকাউন্ট থেকে পৌনে ৪ হাজার কোটি টাকার কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। একইসঙ্গে বৈদেশিক মিশনগুলোর আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার গুরুতর লঙ্ঘন ধরা পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এ খাতে অস্বচ্ছতা ও বিশৃঙ্খলাকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাত হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও সরকারের দায়িত্বশীল মহল একে শ্রেফ দুই মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতা বলে আখ্যায়িত করেছে, যাকে প্রকারান্তরে দায়মুক্তি দেয়ার প্রয়াস বলে গণ্য করা যায়। অস্বাভাবিক মাত্রায় অর্থপাচার ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ঘাটতির কারণে দেশে মূল্যস্ফীতিসহ সামাজিক-অর্থনৈতিক খাতে বড় ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে। এহেন বাস্তবতায় সরকার অর্থনৈতিক কৃচ্ছ্রতার নীতি এবং অপ্রয়োজনীয় ও কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে বাজেট বরাদ্দ স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিলেও সিন্ডিকেটেড দুর্নীতি, অর্থপাচার, জালিয়াতির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের প্রক্রিয়া এখনো বন্ধ হয়নি। বৈদেশিক মিশন ও কনস্যুলার অফিসগুলো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধিভুক্ত নিয়মতান্ত্রিক সরকারি প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের জনবল ও আয়-ব্যয়ের হিসাব সরকারি বিধি মোতাবেক নিরীক্ষণ ও তদারকির আওতায় থাকার কথা। এ ক্ষেত্রে যে কোনো ব্যত্যয়, অস্বচ্ছতা ও সমন্বয়হীনতার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের সামগ্রিক কর্মসংস্থান ও জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত বৈদেশিক কর্মসংস্থান, পর্যটন ও রফতানি বাণিজ্যের প্রমোশনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বৈদেশিক মিশনগুলোর উপর। বিদেশে কর্মরত লাখ লাখ কর্মীর পাসপোর্ট, ভিসা প্রসেস ও আইনগত সহায়তাসহ নানাবিধ ডক্যুমেন্টেশনের আনুষাঙ্গিক কাজকর্ম বৈদেশিক মিশনগুলোকে করতে হয়। এসব কাজ করতে গিয়ে প্রবাসী কর্মীদের হয়রানি, ভোগান্তিসহ নানাভাবে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। অন্যান্য দেশের মিশনকে নিজ দেশের কর্মীদের প্রয়োজনে যে ধরনের সহায়তা নিয়ে তৎপর থাকতে দেখা যায় বাংলাদেশ মিশনগুলোর ভূমিকা সে তুলনায় খুবই নগণ্য বলে মনে করেন প্রবাসী কর্মীরা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে মিশনগুলোর কর্মকর্তারা প্রবাসীদের সমস্যা সমাধানে যথাযথ ভূমিকা নিতে পারলে জনশক্তি রফতানির প্রধান বাজারগুলো থেকে রেমিটেন্স আয় আরো বাড়ানো সম্ভব হতো। এসব মৌলিক ও প্রত্যাশিত দায়-দায়িত্ব পালন না করেই বৈদেশিক মিশনগুলোর কর্মকর্তারা জনগণের প্রদেয় অর্থ আত্মসাতে লিপ্ত রয়েছে। একদিকে নিজেরা সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করছে, অন্যদিকে নানাবিধ অপরাধ, প্রতারণা ও জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা চুরি ও পাচার করে বিদেশে পালিয়ে থাকা ব্যক্তিদের সহযোগী হিসেবেও তারা কাজ করছে। রাজনৈতিক-অর্থনৈতিকভাবে একটি ক্রান্তিকালে পড়েছে দেশ। সরকারের দুর্নীতিবাজ আমলারা লুকোচুরি করে, উটপাখির মতো বালিতে মাথা ঢুকিয়ে বড় বড় রাঘব-বোয়াল দুর্নীতিবাজদের যতই আড়াল করতে চান না কেন, কোনো কিছুই আর গোপন থাকছে না। একের পর এক বড় বড় দুর্নীতি ও হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের ঘটনা ফাঁস হওয়ার পরও সরকারের পক্ষ থেকে ধামাচাপা ও প্রকারান্তরে দায়মুক্তির প্রবণতা সম্পর্কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বসাম্প্রতিক বার্ষিক প্রতিবেদনে তথ্যভিত্তিক সমালোচনা করা হয়েছে। সরকারের সংশ্লিষ্টদের পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনের নিষ্ক্রিয়তারও সমালোচনা করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আমাদের দেশের অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে বিদেশি উন্নয়ন অংশীদাররা কথা বলার সুযোগ পাবে, এটা কারো কাম্য নয়। স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন, বিচার বিভাগসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার লাগাম টেনে ধরার ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রভাবশালী দেশের তাগিদকে দেশের মানুষ ইতিবাচকভাবেই গ্রহণ করে থাকে। ৬২টি কনস্যুলার অ্যাকাউন্টে হাজার হাজার কোটি টাকার ঘাপলা সম্পর্কে অভিযোগ খতিয়ে দেখে এ সম্পর্কে অস্বচ্ছতা দূর করা এবং দোষী ব্যক্তিদের জবাবদিহিতা ও বিচার নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। আইনজ্ঞদের মতে, বিধিবহির্ভূতভাবে সরকারি অর্থব্যয় ও আত্মসাতের মতো অভিযোগ প্রমাণিত হলে অর্থদন্ডসহ যাবজ্জীবন পর্যন্ত কারাদন্ডের বিধান রয়েছে। দুদকের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় তদন্ত সাপেক্ষে এ ধরনের অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত করা না হলে বিদেশি মিশনগুলোতে কাজের সমন্বয়হীনতা, দুর্নীতি ও অর্থআত্মসাৎ বন্ধ হবে না। এইসঙ্গে বৈদেশিক মিশনগুলোতে সৎ, দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।